সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৯

গাড়ি ভাড়ার অভাবে জেএসসি দিতে পারল না চার শিক্ষার্থী


অনলাইন ডেস্ক:
অনেক চড়াই উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া শিখানোর চেষ্টা করেও সফল হতে পারলেন না চার জেএসসি পরিক্ষার্থীর বাবা-মা। অবশেষে দারিদ্র্যতার কাছে হার মানলেন তারা। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য সন্তানকে গাড়ি ভাড়াও দিতে পারেন নি। ঘটনাটি ঘটেছে নওগাঁর মান্দার তেঁতুলিয়া ইউপির শ্যামপুর গ্রামে।

ওই গ্রামের একটি বিদ্যালয় থেকে চার পরীক্ষার্থীর কেউই জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। কয়াপাড়া কামার কুড়ি উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিতির স্বাক্ষর দেখার সময় বিষয়টি প্রকাশ পায়। পরে জানা যায় গাড়ি ভাড়ার অভাবে তারা পরীক্ষা দিতে পারেনি।


সদর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের গ্রামটির নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ২০ বছর আগে শ্যামপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়। বছরের পর বছর স্থানীয়দের অনুদান ও সহযোগীতায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছিল। শিক্ষকরাও প্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রম ও নিজেদের পকেট থেকে টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-এলাকাবাসীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়া ও শিক্ষকদের অনীহার কারণেই এমনটি ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বিদ্যালয়টি থেকে এ বছর জেএসসিতে চারজন (দুই জন মেয়ে ও দুই জন ছেলে) পরীক্ষার্থী অংশ নেয়ার কথা থাকলেও কেউ অংশ নেয়নি। বিদ্যালয় থেকে কেন্দ্রের দূরুত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার। যেখানে আসা-যাওয়ার ভাড়া প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের জন্য ভাড়ার টাকা না থাকায় পরীক্ষা দিতে পাঠাতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা থাকলেও ভাড়ার কারণে হয়ত এমনটি হয়েছে।

শ্যামপুর নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা নিজে থেকে চাঁদা দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যালয়টি ধরে রেখেছি। এ বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে ১২ জন এবং ২০১৮ সালে সাতজন জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শতভাগ পাশ করে। এ বছরও চারজন পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। শিক্ষার্থীদের পরিবারের সাথে কথা বলেছিলাম, পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য। তারা জানায়, ভাড়া দিয়ে আমাদেরকেই পরীক্ষার কেন্দ্রে নিয়ে যেতে। যেখানে আমরা চলতে পারি না, সেখানে টাকা খরচ করে কিভাবে পরীক্ষার কেন্দ্রে নিয়ে যাবো?

তিনি আরো বলেন, প্রতিবছরই এমপিও হওয়ার আশ্বাস পাই। কিন্তু কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করার জন্য স্থানীয় এমপিসহ বিভিন্ন দফতরে জানানো হয়েছিলো। এ বছরও পার হয়ে গেল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। আগামীতে হয়তো প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে হবে।

বিদ্যালয় সূত্রানুযায়ী, ১৯৯৮ সালে বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়। এরপর ২০০০ সালে ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিম্ন মাধ্যমিক হিসেবে পাঠদানের অনুমতি পায়। প্রধান শিক্ষকসহ মোট ছয়জন শিক্ষক রয়েছেন। এছাড়া একজন পিয়ন ও একজন অফিস সহায়ক রয়েছেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৫ জন। শুরুতে ৭৬ শতাংশ জায়গার উপর মাটির ঘর ছিল। এখন সেখানে একটি আধপাকা ইটের ঘর যা অফিস কক্ষ এবং টিনের বেড়া ও টিনের ছাউনির তিনটি কক্ষ, যেখানে পাঠদান করা হয়।

কয়াপাড়া কামার কুড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব আজাহারুল ইসলাম বলেন, প্রথম দিন বাংলা পরীক্ষা হয়। পরীক্ষা শুরুর কিছু পর পরীক্ষার্থীদের উপস্থিতি গণনা শুরু হয়। কেন্দ্রের ৯ নম্বর কক্ষে দেখা যায় চারজন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল শ্যামপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

মান্দা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালাম বলেন, আমার যেটা মনে হয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। শিক্ষার্থী আছে কিনা সন্দেহ। আরেকটি বিষয় হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন থেকে এমপিও না হওয়ায় সঠিকভাবে চলছিল না।

মান্দার ইউএনও আব্দুল হালিম বলেন, বিষয়টি জানা নেই। শিক্ষা অফিসারের কাছ থেকে জানতে হবে। তবে প্রতিষ্ঠান থেকে কেন পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি তা জেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.